ইসরায়েলের কবল থেকে মুক্তি মিলবে কবে

বড় বিচিত্র এই বিশ্ব। সেই বিচিত্রতাকে আরও বাঙ্্ময় করেছে ইতিহাস। ধর্মভিত্তিক জাতি বিভাজনে মানুষের প্রকরণও জটিল। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ‘ইহুদি জাতি’ ও ‘ইসরায়েল’ একটি সমার্থক শব্দযুগল হয়ে তাবৎ বিশ্বে সমাসীন। পশ্চিমা বিশ্বের ইসরায়েল তথা ইহুদি জাতিকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে অন্যায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও টিকিয়ে রাখার যারপরনাই অব্যাহত প্রচেষ্টার বিপরীতক্রমে মুসলিম জাহানের জন্য ইসরায়েল এক জবরদখলকারী নিপীড়ক রাষ্ট্র। সাদা চোখে এ রকম সব সমীকরণ করাই যায়, কিন্তু গহিনের চিন্তার বিস্তারে অনেক রসায়ন প্রযুক্ত।

ইসরায়েল, ফিলিস্তিন, ইহুদি- এদের বৃত্তান্ত জানতে আদি পিতা ইব্রাহিম (আ.) থেকে শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শুধু মুসলমানদের নয় খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মের সঙ্গেও ইব্রাহিম (আ.)-এর যোগসূত্র রয়েছে।

ফিলিস্তিন শব্দের সঙ্গেই মধ্যপ্রাচ্যে তাদের শিকড়ের সন্ধান মেলে। হিব্রু শব্দ ‘পেলেসেত’ থেকে বিকশিত ফিলিস্তিন শব্দের অর্থ ভূমধ্যসাগরের কোলঘেঁষা লম্বা-চওড়া উপত্যকা। আবার আরবি ফিলিস্তিনের গ্রিক নাম ‘প্যালেস্টাইন’।

ফিলিস্তিন ও ইহুদিদের ঐতিহাসিক স্মারক ও ধর্মীয় প্রবাহের নিদর্শন এ এলাকায় ব্যাপ্ত। এমনকি খ্রিস্টানদের তীর্থভূমিও এ অঞ্চল। এ কারণেই সবাই ভূমির দাবিতে অবিচল। তবে মুসলিমদের ঐতিহাসিক স্বীকৃত ভূমি থেকে, বিশেষত পশ্চিম তীর ও গাজা থেকে বাস্তুচ্যুতি এবং গণহত্যা শুধু নিন্দাযোগ্য নয়, মানবতাবিরোধী গণহত্যা ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বিশ্বরাজনীতি এখন দেনা-পাওনা ও টিকে থাকার হিসাবে মগ্ন। এ জন্য ইহুদিদের পুঁজি ও প্রযুক্তির সঙ্গে পশ্চিমাদের আত্মীয়তার বন্ধন মজবুত এবং বিশ্ববিবেককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পশ্চিমারা সব ধরনের নীতি-নৈতিকতা উপেক্ষা করে ইসরায়েল রাষ্ট্র কায়েম রাখতে বদ্ধপরিকর। ফিলিস্তিনিরা আজ নিজ ভূমে পরবাসী। ফিলিস্তিনিদের প্রতি এমন অনাচার সভ্যতার জন্য লজ্জাবাহী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হিটলারের পতন হলে বিশ্বপট পাল্টাতে থাকে। হিটলারের ইহুদিবিদ্বেষের পরিবর্তে পশ্চিমাদের ইহুদিপ্রীতি তখন টইটম্বুর। পশ্চিমারা ‘উইন উইন গেমে’ এবং ভবিষ্যতে আরব জাহানকে পদানত রাখতে কায়দা করে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনের বুকে জোর করে জবরদখল রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করে।

সংগত কারণেই ইসরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টির পর আরব দেশের সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই আছে। ফিলিস্তিনিদের জাতীয় জীবনে মহাবিপর্যয় (নাকবা) ঘনীভূত হয়েছে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার দিন থেকে। ইহুদিদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী বিস্ময়কর উত্থানের বিপরীতে ফিলিস্তিনিরা যেন মার খাওয়া, বাড়িঘর বিধ্বস্ত, মুখপোড়া এক জাতি। প্রতিদিন গুলি, হত্যা নির্যাতন ফিলিস্তিনিদের জন্য যেন অবধারিত। আরব দেশগুলোর মধ্যপ্রাচ্যের ৫৮টি দেশ নিয়ে গঠিত ওআইসি ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো লাগসই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারেনি। জাতিসংঘ নানা নিন্দা জ্ঞাপন ও প্রতিবাদ জানালেও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফিলিস্তিনিদের মাতৃভূমি রক্ষার জন্য বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সংগঠনের লড়াইগুলোও জোরলো হলেও যথেষ্ট নয়। বরং ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে ফিলিস্তিনি নাগরিক অধিকার সীমিতকরণ আইন, ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভূমি বাজেয়াপ্তকরণের একাধিক আইন, দেশের যে কোনো এলাকায় বাস করার অধিকার খর্ব করা হয়েছে। ইহুদি ও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য তৈরিতে ইসরায়েলে কমপক্ষে ৬৫টি আইন রয়েছে। এতেই ক্ষান্ত হয়নি, ফিলিস্তিনিদের জন্য বৈষম্যমূলক তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক মর্যাদা দিয়েছে ইসরায়েল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এত নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা বহাল থাকলেও সভ্যতার দাবিদার পশ্চিমারা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। অন্যদের বেলায় পান থেকে চুন খসলেই পশ্চিমারা জায়নবাদী আচরণ বলতে দ্বিধা করে না, কিন্তু ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ভিন্ন। পুঁজিদাসের এই বিশ্বব্যবস্থায় এ আরেক বাস্তবতা।

পূর্বকাল থেকেই ইহুদিদের উত্থানের চিত্রটি সংহত ও জাতি জাগরণের জন্য সংকল্পবদ্ধ। ১৭৮৯-এ ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপে ইহুদিরা অবলোকন করে, তাদের নাগরিক অধিকার থাকলেও খ্রিস্টান সমাজে তারা আদৃত নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প-বাণিজ্যের সব ক্ষেত্রে ইহুদিদের অর্জন ও অবদান অসামান্য হলেও ইউরোপীয় সমাজে তাদের আত্তীকরণ ঘটেনি। বরং রাশিয়াসহ কিছু দেশে ইহুদি নির্যাতনের জন্য ‘পগ্রম’ (ঢ়ড়মৎড়স) নামীয় ইহুদি নির্যাতনের অভিযান চলত। তারা ছক কষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তিকে সহায়তা করে। তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটি অনেক আগেই এগিয়ে রেখেছিলেন ইহুদি হাইকমিশনার সামুয়েল হারবার্ট। ব্রিটিশরা তাকে ১৯২০ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্যালেস্টাইনের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই রাষ্ট্রদূত ‘দ্য হেগ কনভেনশনের’ ব্যত্যয় ঘটিয়ে প্যালেস্টাইনে ইহুদি বসতি উন্মুক্ত করে দেন। প্যালেস্টাইনের বিরোধিতা দমাতে ইহুদিদের সহায়তায় ফিলিস্তিনিদের নির্মমভাবে দমন এবং ফিলিস্তিনিদের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি অনেকটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পক্ষান্তরে সুযোগ বুঝে ইহুদিরা সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে আরবদের প্রতিরোধ ছিল বিচ্ছিন্ন ও নেতৃত্ববিহীন। কূটবুদ্ধিসম্পন্ন ও ধূর্ত ইহুদিরা তাদের বসতির আশপাশের আরব গ্রামগুলোতে আক্রমণ চালিয়ে সেগুলো জনশূন্য করতে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মোক্ষম সুযোগ পায় ইহুদিরা। প্যালেস্টাইনের উত্তাল পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৭ সালের ২ এপ্রিল প্যালেস্টাইন সমস্যা সমাধানের জন্য জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২৯ নভেম্বর প্যালেস্টাইন বিভক্তির প্রস্তাব অনুমোদন করে। অনুমোদনের হিস্যা অনুসারে ম্যানভেট ভূমির ৪৩ শতাংশ পাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র, নেগের মরু অঞ্চলসহ ৫৬ শতাংশ ইহুদি রাষ্ট্র এবং ১ শতাংশ থাকবে জাতিসংঘের অছি পরিষদ নিয়ন্ত্রিত জেরুজালেম ও বেথলেহেম নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক এলাকা। ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে নিজেদের রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন সাদরে গ্রহণ করে ইহুদিরা, কিন্তু নিজেদের ভূমিতে অন্যের অধিকার বিবেচনায় ফিলিস্তিনিরা এই বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করে। শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের লাগাতার যুদ্ধ। সমর শক্তি ও পশ্চিমাদের সহায়তায় প্রতিদিন ফিলিস্তিনিদের গ্রাম দখল করে অধিকৃত এলাকা বাড়াতে থাকে ইসরায়েল। অধিকৃত ভূমিতে ভূমিচ্যুত ফিলিস্তিনির সংখ্যা কমতে থাকে। আরব দেশগুলোর সামষ্টিক ব্যর্থতায় ফিলিস্তিনিদের মুক্তির জন্য যুদ্ধরত হারাকাত আল-মুকাওয়ামা আল ইসলামিয়া (হামাস) বা ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন ফিলিস্তিনের একটি রাজনৈতিক দল, যারা গাজা নিয়ন্ত্রণ করত এতদিন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ‘হামাস’ ইসরায়েলে আক্রমণ করলে ফিলিস্তিন ও ইহুদিদের যুদ্ধ মারাত্মক রূপ নেয়। হামাসের হামলায় ১২০০ মানুষ নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থারূপে ইসরায়েল চরম ব্যবস্থা নেয়। ‘হামাস’ নিয়ন্ত্রিত গাজাকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, ৪৬ হাজার ৭৮৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয় গত পনেরো মাসের যুদ্ধে।

ইসরায়েলি বাহিনীর আক্রমণে বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক সংখ্যায় প্রাণহানি ঘটেছে। রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি, হাসপাতাল- কোনো কিছুই রক্ষা পায়নি। পুরো গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত ধ্বংসযজ্ঞ বোধকরি বিশ্বে কোথাও ঘটেনি। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা অফিস (ওসিএইচএ) ধারণা করছে গাজায় অন্তত ১৯ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তচ্যুত হয়েছে, যা কিনা গাজার মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ। সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে, যা সহসাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

বরাবরের মতো আরব দেশ ফিলিস্তিনিদের ক্ষতে এখন মলম লাগানোর চেষ্টা করছে। যদিও ইসরায়েলিদের জায়নবাদী যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের রক্ষার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি তারা। গাজায় এখন হামাস ও ইসরায়েলের মাঝে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চলছে। উভয় পক্ষ জিম্মি হস্তান্তর করেছে।

সম্প্রতি গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে মিশরে আবর দেশ মিটিং করেছে। গাজা পুনর্গঠনে ৫ হাজার ৩ কোটি ডলারের একটি পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে মিশর। এই কঠিন দুর্যোগকালে ফিলিস্তিনিদের বিপর্যস্ত অবস্থাকে পুঁজি করে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্ররা ফিলিস্তিনিদের সমূলে ধ্বংস করার নীলনকশা আঁকছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ও ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের প্রস্তাব দিয়ে ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে বিতাড়নের নকশা করেছেন। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের নতজানু অবস্থা বুঝে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতিতে জায়নবাদী শর্ত জুড়ে দিয়েছে- ‘গাজাকে সম্পূর্ণ সামরিক শক্তিহীন করা।’ চলছে গাজায় হামাসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিকল্প প্রশাসনব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পশ্চিমা মিত্ররা ফিলিস্তিনি নিধনের যে কোনো পরিকল্পনায় আগের মতো অবধারিতভাবে একাট্টা। এই পরিপ্রেক্ষিতে গাজা যুদ্ধের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী কাতারের সুর মৃদু হলেও ভিন্ন। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা ফিলিস্তিনিদের হাতেই থাকা উচিত, বাইরের কোনো পক্ষের নয়। আরব দেশের এসব কথা বিশ্বরাজনীতিতে বড় প্রভাবক নয়। বরং সম্ভাবনার একটা ক্ষীণ ধারা উঁকি দিয়েছে চীনের কথায়। চীন বলেছে, ফিলিস্তিনিরা কোথাও যাবে না। পরিবর্তিত বিশ্বরাজনীতিতে চীনকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। চীন যদি তাদের বক্তব্যে অনড় থাকে, সঙ্গে ইহুদি, এ ছাড়া ভিন্ন অন্য জাতিগোষ্ঠীর সমর্থন থাকে তাহলে হয়তো ফিলিস্তিনিদের জন্য মন্দের ভালো বিবেচনায় কোনো নতুন পথ খুলতে পারে।

খান মাহবুব : গবেষক ও প্রকাশক, খণ্ডকালীন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়