গুতেরেসের সফর : সংকটে কতটা আশাজাগানিয়া
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস চার দিনের ঠাসা কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করে ১৬ মার্চ ফিরে গেছেন। তার সফরের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে গিয়ে তাদের দুর্দশা দেখা এবং তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা। রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশুরা দেশে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছে। আর রোহিঙ্গা নেতারা রাখাইন গণহত্যার বিচারের দাবি জানানোর পাশাপাশি প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশে তারা আর কতদিন থাকবেন? তারা বলেন, ‘মিয়ানমার জান্তা সরকার আমাদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। বাংলাদেশ তখন আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। এখন আমরা আমাদের স্বদেশ মিয়ানমারে ফিরতে চাই। মিয়ানমার আমাদের দেশ।’ গুতেরেস বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশ্ব এক গভীর সংকটের দ্বারপ্রান্তে।’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জাতিসংঘ মহাসচিবের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে তাদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র দেখা এবং দুর্দশার কাহিনি শোনার পর সংকট সমাধানে কতটা প্রভাব ফেলবে। অপরদিকে রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, রোহিঙ্গারা আগামী বছরের রমজানের আগেই দেশে ফিরে গিয়ে রমজানের ঈদ করবে। প্রধান উপদেষ্টার এই আশাবাদ থেকে বাস্তবতা কত দূরে, তা-ও ভেবে দেখার বিষয়।
জাতিসংঘের মহাসচিব ১৩ মার্চ বিকেলে ঢাকায় আসেন। তার সফরের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচির মধ্যে ছিল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন, রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে কাজ করা জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত হওয়া। তিনি বাংলাদেশের যুবসমাজ এবং নাগরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে মত বিনিময় করেছেন। গুতেরেস বিএনপি, জামায়াত, নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ সাতটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে বিএনপি দ্রুত সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচনের কথা বলেছে। জামায়াত সংস্কার ও জাতীয় ঐক্যে গুরুত্ব দিয়েছে। আর এনসিপি আইন-গণপরিষদ নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজনের কথা বলেছে। বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থাসহ সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত ছয়টি সংস্কার কমিশন জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক করে সংস্কারের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছে। সংস্কার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে গুতেরেসে বলেছেন, ‘সংস্কার কীভাবে, কতখানি হবে তা জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হয়ে করতে হবে। গণতান্ত্রিক উত্তরণে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকা জরুরি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী ও বিচার বিভাগ থেকে সত্যিকারের পৃথকীকরণ জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে বাংলাদেশের দিক থেকে জাতিসংঘ মহাসচিবের সফরে বড় প্রত্যাশা হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তার সক্রিয় ও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া। কেননা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ এখন এক নাজুক অবস্থার মধ্যে আছে। আট বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক জান্তার গণহত্যার জেরে রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসা শুরু করে। তাদের এই আসা ছিল নাফ নদের স্রোতের মতো। হাজারে হাজারে আসতে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা এখন ১২ লাখ অতিক্রম করে গেছে। বাংলাদেশ সম্পূর্ণ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়। তখন বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকায় রোহিঙ্গারা সহসা তাদের বাড়িঘরে ফিরে যেতে পারবে। বিগত সময়ে কয়েকবার এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব উদ্যোগ সফল হয়নি। বরং রোহিঙ্গা সমস্যা দিন দিন বেড়ে রীতিমতো সংকটে পরিণত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বছরের পর বছর অবস্থানের কারণে কক্সবাজার অর্থনৈতিক, সামাজিক, নিরাপত্তা, পরিবেশ ও সংস্কৃতির দিক থেকে এক নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবসা, চোরাচালানসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে। একাধিকবার ক্যাম্পে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের এক ধরনের দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। রোহিঙ্গাদের কারও কারও বেআইনিভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরির ঘটনা ফাঁস হয়েছে। সরকারের কিছু লোকের সঙ্গে যোগসাজশে দালালচক্র এসব বেআইনি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত। এসব ঘটনা ছাড়াও রাখাইনের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করেন। এমন এক প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। তিনি কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনকালে কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতার সঙ্গে কথা বলেন। গুতেরেসে অনেকটা আকস্মিকভাবে রোহিঙ্গাদের ঘরে প্রবেশ করেন। দেখতে পান রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনযাপনের চিত্র। জাতিসংঘ মহাসচিবকে কাছে পেয়ে তারা বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া এবং নির্মম নির্যাতনের কথা তুলে ধরে। তিনি রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত লার্নিং সেন্টারে নারী শিশুদের কথা শোনেন। তাদের সবার এক কথা যে, তারা স্বদেশে ফিরে যেতে চায়। আরাকান সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মাস্টার মোহাম্মদ জুবায়ের জাতিসংঘের মহাসচিবকে বলেছেন, ‘২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমার বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়। রোহিঙ্গারা আর বাংলাদেশের শরনার্থী ক্যাম্পে থাকতে চায় না। যে কোনোভাবে আরাকানে নিজ নিজ বাড়িঘরে ফিরে যেতে চায়।’ রোহিঙ্গাদের এই নেতা জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতি দ্রুত তাদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
পরে আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজারে এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে এক ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘তারা বাড়ি ফিরে যেতে চায়। মিয়ানমার তাদের মাতৃভূমি। নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে ফিরে যাওয়াই এই সংকটের প্রাথমিক সমাধান।’ রাখাইন রাজ্যসহ মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, ‘মিয়ানমারের সব পক্ষের প্রতি আমার বার্তা স্পষ্ট, সর্বোচ্চ সংযম অনুশীলন করুন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুসারে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিন এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতার আরও উসকানি রোধ করুন।’
জাতিসংঘ মহাসচিব বর্তমান পরিস্থিতিতে মানবিক সংকটের দোরগোড়ায় মন্তব্য করে বলেছেন, ‘আর্থিক সহায়তা কমার ফলে ২০২৪ সালে মানবিক সহায়তার তুলনায় ২০২৫ সালে সহায়তা নাটকীয়ভাবে ৪০ শতাংশ নেমে আসার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এটি বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। মানুষ কষ্ট পাবে এবং মারা যাবে। এরই মধ্যে অনেক কষ্ট ভোগ করা ব্যক্তিদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনই সাহায্য করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নষ্ট করার মতো সময় নেই।’ আন্তোনিও গুতেরেস জানিয়েছেন যে, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে ইউরোপের মানবিক সহযোগিতা নাটকীয়ভাবে কমানোর ঘোষণা মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে। ওই সহায়তা কমানোর ফলে জাতিসংঘ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে খাদ্যের রেশন কমানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। প্রকাশিত এক তথ্যে জানা যায়, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি) জনপ্রতি রোহিঙ্গাদের খাদ্য বরাদ্দ অর্ধেক করে দিয়েছে, যা ১২ ডলার থেকে ছয় ডলার অর্থাৎ অর্ধেকে নেমেছে। যদিও বাংলাদেশ সফরে গুতেরেস তহবিল সংকটের সার্বিক ঝুঁকি তুলে ধরে অনুদান বাড়াতে বিষয় সম্প্রদায়ের প্রতি আবেদন রেখেছেন। তবে এই আবেদনে খুব একটা সাড়া মিলবে, এমন মনে করার কারণ নেই।
এদিকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে চলমান সংকটের মধ্যে আরেকটি বড় ধরনের ইস্যু বাংলাদেশের সামনে চলে এসেছে। যেই ইস্যুকে স্পর্শকাতর বলে মনে করে ঢাকা। সম্প্রতি মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী রাখাইন দখলে রাখা আরাকান বাহিনীকে কোণঠাসা করতে সব ধরনের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে চলতি মাসে এপ্রিলে সেখানে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে রাখাইনে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য মানবিক সহায়তা পাঠাতে চায় জাতিসংঘ। রাখাইনে যাওয়ার করিডর হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এই ইস্যুতে ঢাকা ‘ধীরে চলো’ নীতি অনুসরণ করতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে একাধিক কারণে বাংলাদেশের নিরাপত্তার ঝুঁকির বিষয়টি জড়িত বলে মনে করা হচ্ছে। এই অঞ্চলটি এমনিতে মাদক, অবৈধ অস্ত্র এবং নারী ও শিশু পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে পরিচিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে করিডর দিলে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র বাংলাদেশের প্রবেশের আশঙ্কা আরও বেড়ে যাবে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, আগে সাহায্যের একটি চালান যেতে দিলেও দ্বিতীয়টিতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সফরের তৃতীয় দিনে গুতেরেস পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে নিয়ে যৌথ প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আরাকান আর্মিকেও আলোচনায় যুক্ত করা উচিত। আরাকান আর্মিও এখন একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমি মনে করি, তাদের সঙ্গেও প্রয়োজনীয় সংলাপ হওয়া উচিত।’
বৈশ্বিক সহযোগিতা ব্যাপকভাবে কমার আশঙ্কা, রাখাইন রাজ্যসহ মিয়ানমারের ভয়াবহ পরিস্থিতি ইত্যাদি রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশকে এক কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সফরের পর বাংলাদেশ আট বছর ধরে বিদ্যমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাবে কিনাÑ তাই এখন দেখার বিষয়।
খায়রুল আনোয়ার : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)